‘রাজাকার’ বলাকে কেন্দ্র করে ভোলায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত ১৫

ভোলার সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নে বিজয় দিবসের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ‘রাজাকার’ বলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এ সহিংসতায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এ সময় কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে ভোলা সদরে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের জামায়াত নেতাকর্মীরা অংশ নেন। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে শোভাযাত্রাটি ভেলুমিয়া বাজার এলাকায় পৌঁছালে জামায়াত কর্মী আবুল বাশারকে ‘রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপি কর্মী রিয়াজ। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

একপর্যায়ে রিয়াজ চোখে আঘাত পান এবং উত্তেজনার মধ্যে বিএনপির কয়েকজন কর্মী আবুল বাশারকে মারধর করেন। পরে আহত দুজনকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনার জেরে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এশার নামাজের আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা ভেলুমিয়া বাজারে বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি চরন্দ্রপ্রসাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছালে জামায়াত কর্মীদের সঙ্গে উভয় পক্ষের মধ্যে ফের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়।

সংঘর্ষ চলাকালে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, হামলা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ভেলুমিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল হান্নানসহ অন্তত ১৩ জন আহত হন। আহতদের কেউ স্থানীয়ভাবে, কেউ ভোলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সংঘর্ষের সময় বাজারের পাঁচ থেকে ছয়টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার পর রাত ৯টার দিকে ভোলা সদর উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলটি। সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা জামায়াতের আমির কামাল হোসেন দাবি করেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে দুই দফা হামলা চালিয়ে জামায়াতের অন্তত ১০ জন নেতাকর্মীকে আহত করেছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিজয় দিবসে জামায়াতের মিছিল মেনে নিতে না পেরে এই সহিংসতা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে ভেলুমিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, দুপুরের ঘটনাটি নিয়ে রাতে আলোচনায় বসার কথা ছিল। কিন্তু রাতে বিএনপির বিজয় মিছিল চলাকালে কিছু জামায়াত-শিবির কর্মী উসকানিমূলক আচরণ করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। তার দাবি, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ফলে বিএনপিরও কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন।

এ বিষয়ে ভোলা সদর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ভালো থাকলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কারণে জামায়াত সংঘাতমুখী অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন বানচাল করতেই তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভোলা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নৌবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। উভয় পক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




বরিশালে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বানৌজা অদম্য’ প্রদর্শন

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বরিশালে সর্বসাধারণের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বানৌজা অদম্য’ প্রদর্শন করা হয়েছে। এ প্রদর্শনী ঘিরে নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।

মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নগরীর কীর্তনখোলা নদীর তীরে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে যুদ্ধজাহাজটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষ চার ঘণ্টা ধরে জাহাজে প্রবেশ করে পরিদর্শনের সুযোগ পান।

দুপুরের পর থেকেই যুদ্ধজাহাজটি দেখতে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে অনেকেই জাহাজ পরিদর্শনে আসেন। কাছ থেকে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ দেখার সুযোগ পেয়ে দর্শনার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা বিধান মণ্ডল বলেন, “যুদ্ধজাহাজ সাধারণ মানুষের দেখার সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায় না। বিজয় দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এমন আয়োজন আমাদের জন্য গর্বের।”

রূপাতলী এলাকার এক অভিভাবক বলেন, “শিশুদের নৌবাহিনী সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছি। জাহাজটি ঘুরে দেখতে পেরে আমরা সবাই খুব আনন্দিত।”

যুদ্ধজাহাজটির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আরিফ হোসেন বলেন, “বানৌজা অদম্য সমুদ্রে আন্তঃ ও বহিঃশত্রু মোকাবিলায় সক্ষম একটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ। দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এটি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণ জনগণকে নৌবাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতেই বিজয় দিবসে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

প্রদর্শনী চলাকালে জাহাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌসদস্যরা দর্শনার্থীদের জাহাজের বিভিন্ন অংশ, সরঞ্জাম ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন।

মো: তুহিন হোসেন,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম




বরিশালের একদিন, মুক্তিযুদ্ধের বহুদিন

মঙ্গলবারের সকালটা শুরু হয়েছিল নীরব শ্রদ্ধা আর গভীর আবেগে। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টা পেরিয়েছে। বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্যরা। লাল-সবুজের আবরণে মাথা নত করে তাঁরা যেন ফিরে তাকাচ্ছিলেন ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অথচ গৌরবময় দিনগুলোর দিকে।

এরপর ইতিহাসের পথে হাঁটা শুরু হয় নতুনভাবে। সদর রোডে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির নিজস্ব কার্যালয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের তথ্য, চিত্র ও দলিলপত্রের ২১তম প্রদর্শনী। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী এ আয়োজন যেন পরিণত হয় একটি জীবন্ত আর্কাইভে—যেখানে অতীত কথা বলে, স্মৃতি জেগে ওঠে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ দেশের মানুষের স্মৃতিতে, চেতনায় তা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের কাছে পৌঁছে দিতেই এমন আয়োজন জরুরি।”

প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ—তিন শতাধিক বই আর তিন শতাধিক দুর্লভ আলোকচিত্র। কোথাও যুদ্ধের অভিযানের দৃশ্য, কোথাও প্রশিক্ষণের মুহূর্ত, কোথাও শহীদদের মুখ। ইতিহাসের নীরব ভাষা যেন ছবিতে ছবিতে কথা বলে।

এক কোণে রাখা গানবোটের কামানের গোলা আর শত্রুপক্ষের নৌযান ধ্বংসে ব্যবহৃত মাইনের খণ্ডাংশ দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—এগুলো কি সত্যিই যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছিল? উত্তরে ভেসে আসে ইতিহাসের নিরব সাক্ষ্য।

সম্মেলন কক্ষের পথে এগোলে দেখা মেলে রেডিও, সাইক্লোস্টাইল মেশিন, বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে স্থাপিত দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন নথিপত্র। আলাদা করে দৃষ্টি কাড়ে হাতে লেখা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান—কালির রেখায় রেখায় স্বাধীনতার শপথ।

প্রদর্শনীতে আরও রয়েছে চারটি বন্দুক, নৌ-কমান্ডোদের ব্যবহৃত পোশাক, মুক্তিযুদ্ধের পর বরিশালে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য ‘বিজয় বিহঙ্গ’-এর নকশা। পাশাপাশি রাখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন বরিশাল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা বিপ্লবী বাংলাদেশ এবং শান্তি কমিটির একটি চিঠি—ইতিহাসের দুই বিপরীত মুখ যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্রের সামনে ভিড় করে দাঁড়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। কেউ মোবাইলে ছবি তোলে, কেউ নীরবে দেখে, কেউ প্রশ্ন করে শেখে। ইতিহাস যেন পাঠ্যবইয়ের পাতা ছেড়ে নেমে আসে চোখের সামনে।

এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিচুর রহমান খান স্বপন, সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ, বিজয় দিবস উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক সুশান্ত ঘোষ, সদস্যসচিব রবিউল ইসলামসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

দিন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সেতুবন্ধন। বরিশালের এই একদিনে মুক্তিযুদ্ধ যেন আবার হেঁটে গেছে সদর রোডের বুক চিরে, ইতিহাস হয়ে উঠেছে জীবন্ত।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




বরিশালের ছয় আসন: চারটিতে কঠিন চ্যালেঞ্জে বিএনপি

 দীর্ঘ ১৭ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ না থাকায় বরিশালের ছয়টি আসনেই জয় নিয়ে আশাবাদী বিএনপি। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, সহজ পথ পাচ্ছে না দলটি। মাঠে আগে থেকেই সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে অন্তত চারটি আসনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বিএনপি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের সমীকরণে এই নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিত ভোটব্যাংক, সংখ্যালঘু ভোট এবং জোট রাজনীতি।


বরিশাল-১ (গৌরনদী–আগৈলঝাড়া): জটিল সমীকরণ

এই আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন সম্ভাব্য প্রার্থী। তাঁর বিপরীতে ইসলামী আন্দোলনের রাসেল সরদার (মেহেদী) এবং জামায়াতে ইসলামীর কামরুল ইসলাম খান মাঠে রয়েছেন। তবে আসনের সমীকরণ জটিল করে তুলেছেন বিএনপির নির্বাহী সদস্য প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান।

মনোনয়ন না পেলেও মাঠে সক্রিয় থাকা সোবাহানকে ঘিরে গুঞ্জন চলছে, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন। সংখ্যালঘু ভোট এবং আওয়ামী লীগপন্থি ভোটারদের সমর্থন এখানে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট যেদিকে যাবে, জয়ও সেদিকেই ঝুঁকবে।


বরিশাল-২ (উজিরপুর–বানারীপাড়া): অভির প্রত্যাবর্তন ফ্যাক্টর

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম সরফুদ্দিন সান্টু। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল মান্নান এবং ইসলামী আন্দোলনের নেছার উদ্দিন।

তবে সব হিসাব পাল্টে যেতে পারে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভি দেশে ফিরতে পারলে। তাঁর ফেরাকে ঘিরে এলাকায় কৌতূহল ও আলোচনা চলছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী): বহু প্রার্থীর লড়াই

এ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বিপরীতে রয়েছেন জামায়াতের জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ইসলামী আন্দোলনের সিরাজুল ইসলাম এবং এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।

এ ছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে। ফলে এই আসনে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন স্থানীয়রা।


বরিশাল-৪ (হিজলা–মেহেন্দীগঞ্জ): বিএনপির ভেতরে ক্ষোভ

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজিব আহসান। তবে মনোনয়ন ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের অনুসারীদের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক যে পক্ষ দখল করতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।


বরিশাল-৫ (নগর ও সদর): সরোয়ারের দুর্গে হানা

বরিশাল-৫ আসনটি বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। পাঁচবারের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার এবারও প্রার্থী। তবে তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং জামায়াতের মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।

চরমোনাই পীরের বাড়ি হওয়ায় হাতপাখার ভোটব্যাংক এখানে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জোট সমঝোতা হলে এই আসনে ভোটের চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।


বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): সমঝোতার অপেক্ষা

এই আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান সম্ভাব্য প্রার্থী। তাঁর বিপরীতে জামায়াতের মাওলানা মাহামুদুন নবী তালুকদার এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন সমঝোতা হলে ফলাফলের ওপর তার বড় প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বরিশালের ছয়টি আসনে বিএনপি আশাবাদী হলেও বাস্তবে চারটি আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে দলটি। জোট রাজনীতি, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিত ভোটব্যাংক—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে দেবে বরিশালের নির্বাচনী ভাগ্য।




পাবনায় জমি বিরোধে চাচাতো ভাইয়ের গুলিতে বিএনপি নেতা নিহত

পাবনার ঈশ্বরদীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের গুলিতে এক ইউনিয়ন বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) সকালে উপজেলার লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তির নাম বীরু মোল্লা (৪৮)। তিনি কামালপুর গ্রামের আবুল মোল্লার ছেলে এবং লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বীরু মোল্লার চাচাতো ভাই জহুরুল মোল্লা পারিবারিকভাবে বিরোধপূর্ণ একটি জমি থেকে মাটি কাটতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও আপত্তি জানাতে বুধবার সকালে বীরু মোল্লা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে জহুরুল মোল্লার বাড়িতে যান।

এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে জহুরুল মোল্লা ও তার ছেলে ফাঁকা গুলি ছুড়ে বীরু মোল্লা ও তার সঙ্গে থাকা লোকজনকে চলে যেতে বলেন। তবে তারা সেখান থেকে না গেলে পুনরায় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে বীরু মোল্লা মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিনুজ্জামান বলেন,
“পারিবারিক জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন নিহত ব্যক্তি। বাড়ির ভেতর থেকে গুলি চালানো হয়। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।”

এই হত্যাকাণ্ডে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।




বরিশালে বিএনপির দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে স্মৃতিবেদিতে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হাতাহাতির ঘটনায় বরিশালে বিএনপির দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাতে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় এ অভিযোগ দায়ের করেন।

থানা সূত্রে জানা যায়, অভিযোগপত্রে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও প্রায় ২০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উল ইসলাম জানান, মহানগর বিএনপির একজন নেত্রী থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

অভিযোগকারী আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে ফুল দেওয়ার সময় তার ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীরা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের মনোনীত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের অনুসারী

তিনি আরও বলেন, হামলায় জড়িতদের নাম উল্লেখ করে আইনগত প্রতিকার চেয়ে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় দলের অভ্যন্তরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




ধর্ষণ মামলার বাদীকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, হয়রানির বিচার চেয়ে আসামির সংবাদ সম্মেলন

বরিশাল  অফিস ::  বরিশালের বানারীপাড়ায় দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলার বাদীকে গত এক মাসের অধিক সময় ধরে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। এতে মামলার তদন্ত কার্যক্রমেও অগ্রগতি আসেনি। ফলে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষই যথাযথ আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে- হয়রানি করতেই একজন ইউপি সদস্য ষড়যন্ত্র করে মিথ্যা ধর্ষণের মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মামলায় অভিযুক্ত মামুন ফরাজি। এমনকি সত্য সামনে আসার ভয়ে বাদীকেও পুলিশের সামনে আসতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।
রোববার বেলা সাড়ে ১২টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন মামলায় অভিযুক্ত মামুন ফরাজি। তিনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের বচুয়া গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব ফরাজির ছেলে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর ভুক্তভোগী নারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে একটি নালিশি অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত নালিশি অভিযোগটি গ্রহণ করে তা এফআইআর করতে বানারীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জকে নির্দেশ দেন।

আদালতে দাখিল করা নালিশি দরখাস্তে ওই নারী উল্লেখ করেন, তিনি একজন অসহায়। পিতার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিবাহ করায় চার বোন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জীবিকার তাগিদে তিনি বরিশাল শহরে ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নালিশে বলা হয়, ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি দাদা বাড়ি বানারীপাড়া থেকে পায়ে হেঁটে বরিশাল শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি হঠাৎ এসে তাকে জোরপূর্বক নিকটস্থ একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ধর্ষণ করে। কিন্তু ভয়ে তিনি চিৎকার করতে পারেননি। একপর্যায়ে দু’জন পথচারীর কণ্ঠস্বর শুনে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে ওই দুই পথচারীর সহায়তায় অভিযুক্তের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, পরে তিনি বরিশালে এসে বোন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করে থানায় মামলা করতে গেলে নানা ব্যস্ততার কথা বলে মামলা গ্রহণ করা হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

তবে ধর্ষণের এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত মামুন ফরাজি। রোববার (১৪ ডিসেম্বর) বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সবুর খান ওরফে সবুর মেম্বার ও তার সহযোগিরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসিয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে মামুন ফরাজির বাবা মাহাবুব ফরাজি বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সবুর খানের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, ২০০ বছরের পুরোনো হিন্দু বাড়ি দখল, সরকারি ৯ একর জমির গাছ বিক্রির অর্থ আত্মসাৎ, খেয়াঘাট দখল, ট্রলার লুট, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, থানায় পুলিশের সামনে ছাত্রপ্রতিনিধিদের ওপর হামলা, গরিবদের সরকারি সহায়তা আত্মসাৎ, স্কুল কমিটি দখল, প্রবাসীদের অর্থ আত্মসাৎ ও অটোরিকশা দিয়ে চাঁদা উত্তোলনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট সবুর মেম্বারের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী ভুক্তভোগী মাহাবুব ফরাজির কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর তার মালিকানাধীন দুটি ট্রলার ছিনতাইয়ের পর বিক্রি করে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তার ছেলে মামুন ফরাজি বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।

তিনি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সবুর মেম্বার ডিগ্রি পাসের ভুয়া সনদ ব্যবহার করে বাইশারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতির পদ দখল করেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগের পর তদন্ত করে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড ভুয়া সনদের সত্যতা পায় এবং তাকে সভাপতির পদ থেকে অপসারণ করে।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সবুর মেম্বার ও তার সহযোগীরা গত ২৭ অক্টোবর একজন নারীকে ব্যবহার করে মামুন ফরাজির বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দায়ের করায়। আদালতের নির্দেশে ১ নভেম্বর মামলাটি থানায় এজাহার হিসেবে রেকর্ড করা হয়। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান ভুক্তভোগী মাহাবুব ও মামুন ফরাজি।

ধর্ষণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বানারীপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদ হোসেন বলেন, “মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাদীর দেয়া মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এবং যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে, সেখানে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বাদীকে পাওয়া গেলে তদন্ত এগিয়ে নেয়া সহজ হবে।”

এদিকে অভিযুক্ত মামুনের বাবা অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতা সবুর খানের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। তাঁর দাবি, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “সবুর খান ভুয়া সনদ দিয়ে একটি বিদ্যালয়ের সভাপতির পদে ছিলেন। এ বিষয়ে আমার ছেলে শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করলে তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এরপরই পরিকল্পিতভাবে এই ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন বাদীকে পাওয়া না যাওয়ায় আমরাও সঠিক আইনি সহায়তা পাচ্ছি না।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




বানারীপাড়ার দুই শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মরণ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী বানারীপাড়ার দুই সন্তান—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমদ্দার—আজও এলাকার মানুষের মনে অমর। তারা দেশের স্বাধীনতার জন্য বীরত্বপূর্ণ জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং বুদ্ধিজীবী সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার পরিবার ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর রাতে স্বাভাবিকভাবে দিনের কাজ শেষ করে ঘরে ছিলেন। হঠাৎ রাস্তায় জনতার ভিড় ও লাইট বোমার শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পাক সেনারা তাদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ড. গুহঠাকুরতাকে হত্যা করে। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও সঠিক চিকিৎসা সম্ভব হয়নি এবং ৩০ মার্চ ১৯৭১ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ড. গুহঠাকুরতার জন্ম ময়মনসিংহে হলেও পৈত্রিক নিবাস বরিশালের বানারীপাড়ায়। শিক্ষাজীবন শুরু হয় ময়মনসিংহের জিলা স্কুল থেকে, এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও আনন্দমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি শিক্ষকতা, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজচিন্তায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। বানারীপাড়া পৌর শহরে তার নামানুসারে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সুখরঞ্জন সমদ্দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে পরিচিত ছিলেন। ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ পাক সেনারা তাকে তার বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং বিনোদপুরে হত্যা করে ফেলে। তার পরিবার তখন ভারতেই ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেহাবশেষ উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে পুনঃসমাহিত করা হয়।

সুখরঞ্জন সমদ্দারের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে বানারীপাড়ার ইলুহার গ্রামে। তিনি বরিশালের স্থানীয় স্কুল ও কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন, পরে কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করেন।

বানারীপাড়ার মানুষরা দুই শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের ভাস্কর্য নির্মাণসহ প্রজন্মকে জানাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২5




আগৈলঝাড়ায় হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকৃতির রজতজয়ন্তী উদযাপন

বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলায় হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকৃতি পরিচালিত পাঁচটি প্রোডাকশন ইউনিট — বিবর্তন হ্যান্ডমেইড পেপার প্রজেক্ট, কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফটস, তরুলতা ক্রাফটস, জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ এবং বাগধা এন্টারপ্রাইজ — এর রজতজয়ন্তী ও বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৩ ডিসেম্বর, শনিবার, গৈলা ইউনিয়নের কালুরপাড় এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির মাঠে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রজতজয়ন্তীর আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রকৃতির নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার দাস

সভায় স্বপন কুমার দাস বলেন, “লতাপাতা দিয়ে আমরা বিশ্বজয় করেছি। বাড়ির চারপাশে লতাপাতা ও জলাশয়ের কচুরিপানা ব্যবহার করে হাতে বানানো তৈজসপত্র এখন বিশ্বের ৪২টি দেশে পৌঁছেছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ৬ হাজার নারী। বিদেশীরা আমাদের নারীদের হাতে তৈরি নিখুঁত জিনিস দেখে বিস্মিত হয়। তারা প্রশ্ন করেন, এগুলো কি মেশিনে তৈরি করা হয়। আমি জানাই, এটা সম্পূর্ণ হাতে তৈরি। আমাদের দেশের নারীরা এই সব পণ্য তৈরি করে।”

তিনি আরও বলেন, “২০০১ সালে প্রকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি) কর্তৃক শুরু করা আটটি কর্মসংস্থান প্রকল্পের দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করি। প্রাথমিক সময়ে এমসিসি’র পরিচালকরা শাসন ব্যবস্থা, আর্থিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক ন্যায্য বানিজ্যের মানদণ্ড স্থাপন করতে আমাদের সহায়তা করেন। আমরা হস্তনির্মিত কাগজ, পাট, সিল্ক ও প্রাকৃতিক তন্তু উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করি এবং নারী করিগরদের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা নিশ্চিত করি। ধীরে ধীরে প্রকৃতি একটি স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয়।”

প্রকৃতির বোর্ড অব ডিরেক্টর সুфিয়া আক্তার রহমান, আবজালুল নেছা চৌধুরী, হাসিনা আক্তার বলেন, “আমরা ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করি, নিজস্ব পরিচিতি ও প্যাকেজিং তৈরি করি এবং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তুলি। রিসাইকেল করা শাড়ি, বর্জ, পাট ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য আমাদের স্বাক্ষর হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি একটি অলঙ্কারের জন্য আমরা গর্বের সঙ্গে (ডব্লিউএফটিও) মোহাম্মদ ইসলাম ডিজাইন পুরস্কার অর্জন করি। রপ্তানি বৃদ্ধি পায়, কারিগরদের আয় বাড়ে এবং পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সক্ষম হয়। ব্লক প্রিন্টিং, বাঁশের কারুশিল্প ও ক্রোশে খেলনা তৈরির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আমাদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনে। আমরা টেরাকোটা, ফ্যাশন ডিজাইন ও আধুনিক পরিবেশবান্ধব কারুশিল্পেও নতুনত্ব এনেছি। ভবিষ্যতে প্রকৃতি আরও গভীর ক্ষমতায়ন, নবপ্রবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগোবে। আমরা চাই নতুন প্রজন্মের নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠুক।”

তারা আরও বলেন, “২০৫০ সালের মধ্যে হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকৃতি ন্যায্য বানিজ্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে বিশ্বকে দেখাবে যে নৈতিক ব্যবসা সফল হতে পারে এবং গ্রামীণ বাংলাদেশে জীবন পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট: ‘প্রকৃতি ২০৫০, নারী ক্ষমতায়ন, পৃথিবীর টেকসই উন্নয়ন।’”

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বণিক বলেন, “প্রকৃতি আমাদের জেলার গর্ব। রজতজয়ন্তীতে মঞ্চের নির্মাণ ও পরিবেশের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। লতাপাতা, বন, তালপাতা, কচুরিপানা ও ফুলের সংমিশ্রণে তৈরি মঞ্চ আমি আগে কোথাও দেখিনি। আমি এর ছবি তুলে রাখেছি, যেখানে কাজ করব সেখানে দেখাবো।”

রজতজয়ন্তীতে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা সমাজসেবা অফিসার তপন বিশ্বাস, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোসাম্মৎ দৌলাতুন নেছা নাজমা, থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান, পল্লীবিদ্যুৎ বরিশাল-২ সমিতির জিএম বিপুল কৃষ্ণ, আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাব সভাপতি ডা. মো. মাহাবুবুল ইসলাম, সাংবাদিক এসএম ওমর আলী সানি, প্রকৃতি ডেপুটি ডিরেক্টর সজল কৃষ্ণ দত্ত, মো. সাজ্জাদ হোসেন, ম্যানেজার জগন্নাথ দত্ত, কালিপদ অধিকারী, অঞ্জন কুমার, মিজানুর রহমান, এমসিসি ফেরদৌসি হাওলাদার। সভা পরিচালনা করেন ম্যানেজার পাপড়ি মন্ডল


 




বরগুনায় ফেসবুকে প্রচার চালিয়ে মহাবিপন্ন বাঘা আইর মাছ বিক্রি

বরগুনায় ফেসবুকে প্রচারণা চালিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাবিপন্ন ও বিরল প্রজাতির বাঘা আইর মাছ কেটে রান্না করে বিক্রি করা হয়েছে। মাছটির ওজন ছিল ৭০ কেজি।

শনিবার দুপুরে বরগুনা পৌরশহরের জেলা বিএনপির অফিস সংলগ্ন মজিবর হোটেলে মাছটি রান্না করে বিক্রি করা হয়। এর আগে সকাল ১০টায় হোটেলের সামনে মাছটি প্রদর্শন করা হয় এবং স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রচারণাও চালানো হয়।

হোটেল মালিক মজিবর জানান, মাছটি ঢাকার তেজগাঁও বাজার থেকে ৮২ হাজার টাকায় বরগুনার স্থানীয় আড়তদার মোস্তফার মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, “শখের বশে আমি এই মাছ এনেছি। এর আগে হোটেলে বড় বড় মাছ বিক্রি করেছি, তবে বাঘা আইর এবারই প্রথম।”

পরিবেশকর্মী ও পরিবেশ প্রেমী আরিফ রহমান অভিযোগ করেছেন, “বাঘা আইর মাছ শিকার ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এটি মহাবিপন্ন একটি জলজ প্রাণি। হোটেলে রান্না বা বিক্রি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তবে প্রশাসন ও বন বিভাগ এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়নি।”

বরগুনা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। বরগুনা সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক জানান, “ঘটনা সম্পর্কে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি, সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫