প্রশাসনের নীরবতায় হারাচ্ছে ভোলার ঐতিহ্যবাহী জলাশয়

ভোলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দুই শতাধিক বছরের পুরোনো বাংলা স্কুল পুকুর আজ দখলদারদের কবলে। ঐতিহ্যবাহী এই জলাশয়টি একসময় ছিল শহরের সৌন্দর্য ও সংস্কৃতির প্রতীক, কিন্তু এখন সেটি পরিণত হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গলে। গত দুই দশক ধরে নাগরিক সমাজের আন্দোলন ও অভিযোগের পরও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে পুকুরটি।
সর্বশেষ গত বছরের ৫ আগস্টের পরও বেআইনিভাবে পুকুরের তীর ভরাট করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, এই পুকুরের পানি শহরের মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করেন এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় এখান থেকেই পানি সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু অবৈধ দখল ও ভরাটের ফলে জলাশয়টি এখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে।
ভোলা পৌর ভূমি কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে চরজংলা মৌজার ১৬৪ নম্বর খতিয়ানে পুকুরটির আয়তন ছিল ১ একর ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭০ শতাংশে। অর্থাৎ গত কয়েক দশকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গা হারিয়ে গেছে দখল ও ভরাটের কারণে।
স্থানীয়রা জানান, ২০০১ সালে ‘আমেনা প্লাজা’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দখলের ইতিহাস। এরপর বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় পুকুর ঘিরে গড়ে ওঠে শিক্ষক সমিতির কার্যালয়, স্কাউটস ভবন, আওয়ামী লীগ কার্যালয়, চেম্বার অব কমার্স, আমেনা প্লাজা, গোলদার প্লাজা ও আরও অনেক স্থাপনা। এর বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে পুকুরের তীর দখল করে।
বাংলা স্কুলের সাবেক ছাত্র মো. মশিউর রহমান বলেন, “এই পুকুর শুধু একটি জলাশয় নয়, ভোলার সংস্কৃতি, স্মৃতি আর শৈশবের প্রতীক। প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় তা হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।”
ভোলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস. এম. বাহাউদ্দিন বলেন, “২০০৪ সাল থেকে আন্দোলন করছি। মানববন্ধন, স্মারকলিপি, সংবাদ সম্মেলন—সবই করেছি। কিন্তু প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “এখনই উদ্যোগ না নিলে পুকুরটি মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।”
পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, গত ৩০ বছরে ভোলা শহরের শতাধিক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। এখন মাত্র তিনটি সরকারি পুকুর টিকে আছে—বাংলা স্কুল, জেলা পরিষদ ও সরকারি স্কুল পুকুর। এগুলোও রক্ষা না পেলে শহরে জলাবদ্ধতা, পানির সংকট ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়বে।
ভোলার জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, “সরকারি জলাশয় দখল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে এসি ল্যান্ড ও ইউএনওকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পুকুরটি দখলমুক্ত করা হবে।”
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫








