পিরোজপুর সদর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। ১ নভেম্বর রাতে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করে; পরে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। এর কয়েক দিন আগে একই ইউপির সদস্য জাকির হোসেন ও আবুল বাশার এবং বালিপাড়া ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিন সেন্টুর ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
পরে তিনজনকে ভাণ্ডারিয়া থানায় আগে হওয়া একটি চুরির মামলায় অজ্ঞাত আসামির তালিকায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আরেকজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় সদর থানায় মারামারি ও হত্যাচেষ্টা মামলায়। কয়েক দিন হাজতবাসের পর তারা জামিনে মুক্তি পান।
এই জনপ্রতিনিধিদের সবাই বিএনপির সমর্থক। পিরোজপুর জেলা বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সমর্থক জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের মামলা ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাদের বাড়িতে পুলিশি অভিযানের নামে হয়রানি বেড়েছে।
পিরোজপুর-১ (সদর-ইন্দুরকানী-নাজিরপুর) আসনের ইন্দুরকানী উপজেলায় এ ধরনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। আর অভিযোগের তীর জামায়াতের দিকে। বিএনপি নেতাদের দাবি, জামায়াত তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পুলিশ দিয়ে হয়রানি করছে। তবে দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকায় তারা সরাসরি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জানান, গ্রেপ্তার ও হয়রানি এড়াতে পুলিশের সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেন করেছেন।
জানা গেছে, পিরোজপুর-১ আসনে মাসুদ সাঈদী ও পিরোজপুর-২ আসনে শামীম সাঈদী জামায়াতের প্রার্থী। তাদের পিতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পিরোজপুর-১ আসনের এমপি ছিলেন। সাঈদীর বাড়ি ইন্দুরকানী উপজেলায়। পিতার পরিচয় সূত্রে দুই ভাই দুটি আসনে শক্ত অবস্থানে আছেন।
পিরোজপুর-১ আওয়ামী লীগের ও পিরোজপুর-২ জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর স্থায়ী আসন হিসেবে পরিচিত। এ দুটি দলের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বিএনপি কিংবা তাদের নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থী।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তার ইউপি সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তবে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এ বিষয়ে পাড়েরহাট ইউপি সদস্য ইলিয়াছ হোসেন বলেন, আমি ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি। আওয়ামী লীগের সময় নানামুখী চাপ ও উন্নয়নমূলক কাজের স্বার্থে সরকারি কর্মসূচিতে মাঝেমধ্যে যেতাম। আমার নামে ৫ আগস্টের পর কোনো মামলা হয়নি। আওয়ামী লীগ আমলে কেন মেম্বার হয়েছি, সে অজুহাত দেখিয়ে আমার মতো অনেক মেম্বারকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। ডিবি পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আটকের পর লেনদেনের ওপর নির্ভর করে বিস্ফোরক মামলায়, নাকি চুরি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
আবুল বাশার জানান, তাঁকে ৩০ অক্টোবর আটক করে সদর থানায় ৩২৬ ধারার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিন দিন পর আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন। বিএনপি সমর্থক দাবি করা বাশারের অভিযোগ, তাঁকে গ্রেপ্তারে জামায়াতের ইন্ধন রয়েছে। ৩১ অক্টোবর গ্রেপ্তার আরেক মেম্বার জাকির ভাণ্ডারিয়া থানায় চুরি মামলায় দুদিন হাজতবাস করেন।
ইন্দুরকানী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পাড়েরহাট ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তবে বিএনপি সমর্থন করে– সেসব জনপ্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করছে।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগে উপজেলার চেয়ারম্যান-মেম্বারদের নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে যাই। সেখান থেকে ফেরার পরই ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার শুরু করে। কাউকে খুশি করার জন্য পুলিশ এসব করছে।
আওয়ামী লীগ নিয়ে সভা করছে– এমন অজুহাতে গত ২০ অক্টোবর তালা ভেঙে পত্তাশী ইউপি ভবনে তল্লাশি করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীন হাওলাদার ইন্দুরকানী উপজেলা জাতীয় পার্টির (জেপি) আহ্বায়ক। ৪ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে পিরোজপুর শহরের পাড়েরহাট সড়কে বড়পুল এলাকায় তাঁকে অপহরণের চেষ্টায় বেদম মারধর করা হয়। তাঁর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ আসে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, ইন্দুরকানী উপজেলার পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের জামায়াত সমর্থক জাকারিয়া মুন্সীর নেতৃত্বে এ হামলা হয়। তিনি পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদীর সঙ্গে সব সময় থাকেন। খবর পেয়ে ওই রাতে মাসুদ সাঈদী ও শামীম সাঈদী দুজনেই থানায় যান। শামীম সাঈদী চেয়ারম্যান শাহীনের পক্ষ নিলে থানায় দুই ভাইয়ের উত্তপ্ত কথাবার্তা হয়। পরে সমঝোতা হলে শাহীনের ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জেপির প্রতিবাদ সমাবেশে স্থানীয় বিএনপি নেতারাও বক্তৃতা করেন।
ইন্দুরকানী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান জানান, জাকারিয়া মুন্সীর জামায়াতে কোনো পদ নেই, তবে সমর্থক। শাহীন হাওলাদারের ওপর হামলা জামায়াত সমর্থন করে না।
পিরোজপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাঈদুল ইসলাম কিসমত জানান, মামলা ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমরা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা নিরীহ কাউকে হয়রানি করবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বলেন, ২০১৪ সালে জনগণের ভালোবাসায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলাম। জনগণের সমর্থন এখনও অটুট আছে। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পুলিশের হয়রানির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো জনপ্রতিনিধি আমার কাছে অভিযোগও জানাননি। বিভিন্ন মাধ্যমে শুনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশ জানিয়েছে, ৫ আগস্টের আগে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। চেয়ারম্যান শাহীন হাওলাদারের ওপর হামলাকারী জামায়াতের কেউ নন। তাঁর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
পিরোজপুর-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী শামীম সাঈদী জানান, পত্তাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীন হাওলাদারের ওপর হামলার পর বিষয়টি মীমাংসার জন্য তিনি থানায় গিয়েছিলেন। ঘটনার পর এবং কয়েক দিন পরে সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত জাকারিয়া মুন্সী বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন।
শামীম সাঈদী বলেন, এতে প্রতীয়মান হয় যে ঘটনার জন্য তিনি দোষী। তবে তিনি জামায়াতের কর্মী নন, একজন সুযোগসন্ধানী। একই এলাকার হওয়ায় এখন মাসুদ সাঈদীর আশপাশে ঘুরঘুর করতে পারেন।
ইন্দুরকানীর কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে মামলা ছাড়াই গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) খান মুহাম্মদ আবু নাসের বলেন, কাগজপত্র না দেখে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সঠিক কিছু বলা যাবে না।
আটকের পর চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে জানানো হলে এসপি বলেন, তদন্তে চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ পেলে সে তো গ্রেপ্তার হবেই। বিএনপির কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেননি।