বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিবছর মাছ ধরার সরকারি অবরোধ শুরু হলেই স্থানীয় জেলেরা গভীর উদ্বেগে পড়ে। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের প্রজনন রক্ষার জন্য ঘোষিত ৬৫ বা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় আইন মেনে ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হন। অথচ এই সময়েই বরগুনা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের পানিসীমায় ভারতীয় জেলেদের অবাধ বিচরণ ও মাছ শিকারের অভিযোগ উঠে।
পাথরঘাটা, আমতলী ও তালতলীর জেলেরা জানান, তারা সমুদ্রে নামলে জরিমানা, মামলা ও নৌযান জব্দের ভয়ে থাকে। কিন্তু সীমান্তের ওপার থেকে আসা ভারতীয় ট্রলারগুলো বাংলাদেশি পানিসীমায় ঢুকে নির্বিঘ্নে মাছ ধরে নিয়ে যায়। এতে ক্ষোভ তৈরি হয় যে, অবরোধ কার্যত বাংলাদেশের জেলেদের জন্যই কঠোর হলেও বিদেশি জেলেদের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না।
জেলেদের অভিযোগ, ভারতীয় ট্রলারগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী জাল ব্যবহার করে অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ মাছ ধরা শেষ করে। এর ফলে অবরোধ শেষে সমুদ্রে নেমে স্থানীয় জেলেরা মাছের সংকটে পড়েন। তারা মনে করেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদের ওপর ভারতের আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয়রা আরও দাবি করেন, সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত টহল ও নজরদারির অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। অবরোধ চলাকালেও বাংলাদেশের জেলেরা নিষ্ক্রিয় থাকলেও পানিসীমা কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়, যা ভারতীয় জেলেদের সুযোগ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বরগুনার জেলেরা চাইছেন, অবরোধ চলাকালেও জলসীমায় কঠোর নজরদারি, কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার এবং সীমান্ত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হোক। তা না হলে অবরোধের নামে একদিকে বাংলাদেশের জেলেরা নিঃস্ব হবে, অন্যদিকে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ বিদেশি জেলেদের হাতে লুট হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, “সমুদ্র ও পানিসীমা রক্ষার বিষয়টি শুধু জেলেদের নয়, জাতীয় স্বার্থের বিষয়। অবরোধ চলাকালেও বিদেশি জেলেদের অনুপ্রবেশ গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, “জেলেদের অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। অবরোধ সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো ও বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে উত্থাপন জরুরি।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন জানান, “মাছের প্রজনন রক্ষায় অবরোধ গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জেলেদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা দিচ্ছে। অনুপ্রবেশের অভিযোগ পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা করি।”
উপকূলবাসীর প্রত্যাশা, অবরোধের পাশাপাশি বরগুনার পানিসীমা রক্ষায় সমন্বিত, শক্তিশালী ও টেকসই উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ এবং জেলেদের জীবন-জীবিকা উভয়ই নিরাপদ থাকে।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫