চীন সাইবার প্রতারণা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সাইবার স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনার অভিযোগে কুখ্যাত বাই পরিবারের মাফিয়া চক্রের চার সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটি। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যে জানা গেছে, প্রতারণার পাশাপাশি হত্যা, শারীরিক নির্যাতনসহ একাধিক গুরুতর অপরাধে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এই রায় কার্যকর করা হয়।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, গুয়াংডং প্রদেশের একটি আদালতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বাই পরিবারের মোট ২১ জন সদস্য ও সহযোগীকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে চারজনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে। এর আগেও একই মামলায় গত বছরের নভেম্বর মাসে পরিবারের পাঁচ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে গোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে পরিচিত বাই সুওচেং দণ্ড ঘোষণার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তার মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়।
চীনের তদন্ত সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাই পরিবার মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী লাউক্কাইং এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে একটি অপরাধমূলক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সেখানে তারা ক্যাসিনো, অবৈধ বিনোদন কেন্দ্র এবং সুসংগঠিত সাইবার স্ক্যাম নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত। এসব কার্যক্রমে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। স্থানীয় মিলিশিয়া ও সশস্ত্র সহযোগীদের ব্যবহার করে তারা এলাকায় ভয় ও সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল।
তদন্তে উঠে আসে, বাই পরিবার অন্তত ৪১টি আলাদা কম্পাউন্ড গড়ে তোলে, যেখানে জোরপূর্বক আটকে রেখে মানুষকে অনলাইন প্রতারণার কাজে লাগানো হতো। এসব স্থানে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন, মারধর এবং মানসিক চাপের ঘটনা ঘটত। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, এই অপরাধচক্রের কার্যক্রমে অন্তত ছয়জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, একজন আত্মহত্যা করেছেন এবং বহু মানুষ স্থায়ীভাবে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এই অভিযানের আগে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিচালিত অনলাইন স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালায়। এর অংশ হিসেবে মিং পরিবার নামের আরেকটি কুখ্যাত মাফিয়া গোষ্ঠীর ১১ সদস্যের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়। চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব স্ক্যাম নেটওয়ার্কের কারণে হাজার হাজার চীনা নাগরিক প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশে আটকা পড়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০০ সালের শুরুর দিকে লাউক্কাইং অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়। সে সময় স্থানীয় এক প্রভাবশালীকে সরিয়ে দেওয়ার পর বাই পরিবার দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ওই সামরিক অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মিন অং হ্লাইং, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান। সেই সময়কার রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের সুযোগ নিয়েই বাই পরিবার তাদের প্রভাব বিস্তার করে।
তবে ২০২৩ সাল থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অনলাইন স্ক্যাম কার্যক্রমে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় বেইজিং অসন্তোষ প্রকাশ করে। এরপর নীরবে ওই অঞ্চলের জাতিগত বিদ্রোহীদের অভিযানে সমর্থন দেয় চীন। এর ফলেই একের পর এক স্ক্যাম কম্পাউন্ড ভেঙে পড়ে এবং অপরাধচক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হন। পরে তাদের চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চীনে আনার পর এসব অপরাধচক্র নিয়ে একাধিক রাষ্ট্রীয় প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হয়। সেখানে অনলাইন প্রতারণার ভয়াবহতা এবং সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক ফাঁসির মাধ্যমে চীন সম্ভাব্য স্ক্যামার ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের জন্য শক্ত সতর্কবার্তা দিতে চায়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন স্ক্যাম পরিচালনার জন্য কয়েক লক্ষ মানুষকে পাচার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা নাগরিক। এসব স্ক্যামের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





