দেশে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, এই সংকট সামাল দেওয়া সহজ হবে না এবং এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কষ্টদায়ক হতে পারে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জ্বালানির জন-মালিকানাঃ বাংলাদেশের ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে নাগরিক ইশতেহার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ১৫৫টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জেটনেট-বিডি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
ড. ম. তামিম দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি অফিস সময় এগিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, অফিস সময় আগেভাগে শুরু ও শেষ হলে মানুষ দ্রুত বাসায় ফিরতে পারবে। এতে সন্ধ্যা সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার কমবে এবং চাপ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
তিনি জেটনেট-বিডির প্রস্তাবিত ১৪ দফা নাগরিক ইশতেহারের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে সমন্বিত ও কার্যকর জ্বালানি রূপান্তর নীতির অভাব রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকার যতটা সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. তামিম আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে দেশের বিভিন্ন পরিকল্পনায় ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবিত নবায়নযোগ্য নীতি ২০২৫—এই নীতিগুলোর মধ্যে কোনো স্পষ্ট সামঞ্জস্য নেই। এতে নীতিগত সমন্বয়হীনতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অগ্রগতির ধারা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০৬০ সালের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন ২১০০ সালেও সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, নতুন নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হলেও সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরাও অনেক সময় অবগত থাকেন না। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া লক্ষ্য অর্জন কঠিন, এজন্য নাগরিক পর্যায় থেকে চাপ বজায় রাখা জরুরি।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সিইও এম জাকির হোসেন খান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও আদানি ও সামিটের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো বাতিল না করে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। তিনি এসব চুক্তি দ্রুত বাতিলের দাবি জানান।
আইইইএফএ-এর প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অংশ ১০.৭ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ তেলভিত্তিক কেন্দ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা গেলে উৎপাদন খরচ কমে ১১ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) আবুল কালাম আজাদ জ্বালানি রূপান্তরে প্রস্তাবিত ১৪ দফা নাগরিক ইশতেহার উপস্থাপন করেন। এতে নেট জিরো লক্ষ্যসহ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, এই ১৪ দফা প্রস্তাবনা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কাছেও এটি পৌঁছে দেওয়া হবে, যেখানে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশাও যুক্ত থাকবে।





