শ্রীকাইল গ্যাস প্রকল্প বাতিল, বাড়ছে গ্যাস সংকটের শঙ্কা

Views: 14

শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ধরে রাখতে নেওয়া ‘ওয়েলহেড গ্যাস কম্প্রেসর ক্রয় ও স্থাপন’ প্রকল্পের দরপত্র মাঝপথে বাতিল হওয়ায় দেশের জ্বালানি খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শ্রীকাইলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কূপের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চয়তায় পড়বে, তেমনি চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বাপেক্সের অধীনে শ্রীকাইল ২, ৩, ৪ ও ইস্ট–১ কূপে দীর্ঘদিন গ্যাস উত্তোলনের ফলে কূপমুখের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এর ফলে ট্রান্সমিশন লাইনে প্রয়োজনীয় ইনলেট চাপ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই সমস্যা সমাধান ও উৎপাদন ধস ঠেকাতে প্রতিটি ১০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি কম্প্রেসর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, যা এলএনজি আমদানি নির্ভরতা কমাতেও সহায়ক হতো।

প্রকল্পটির কাজ পায় রোমানিয়ার প্রতিষ্ঠান এসসি ইউরো গ্যাস সিস্টেম এসআরএল। ২০২৪ সালের মার্চে চুক্তি সম্পাদনের পর স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বিদেশি অংশে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এই পর্যায়ে এসে হঠাৎ চুক্তি বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে বলে অভিযোগ করা হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি মনিরুল হুদা বলেন, চুক্তি অনুযায়ী কাজের বিপরীতে আংশিক বিল পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। বিল না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। তার দাবি, প্রকল্পে বিলম্বের জন্য বাপেক্সই মূলত দায়ী। চুক্তির দুই মাসের মধ্যে এলসি খোলার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়েছে পাঁচ মাস পর, ২০২৪ সালের আগস্টে। এক বছরের এলসির মেয়াদ শেষে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে পছন্দের কোনো পক্ষকে কাজ দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এ কারণে তারা আদালতে রিট দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন।

অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক ও বাপেক্সের জিএম হাসানুজ্জামান সিকদার দাবি করেছেন, চুক্তি সরাসরি বাতিল করা হয়নি। টানা তিন মাস কাজ বন্ধ থাকায় নিয়ম অনুযায়ী বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানি চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে যে তারা আর চুক্তির সঙ্গে নেই। সে কারণেই নিয়ম মেনেই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এখানে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই।

প্রকল্প বাতিল হলে গ্যাস উৎপাদনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এমন প্রশ্নে বাপেক্স কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তারা স্বীকার করেছেন, কূপগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে, তবে কম্প্রেসর না বসালে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তা নতুন করে সমীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। আগামী দুই বছরে বড় পরিসরে আমদানি বাড়ানোর সুযোগও সীমিত। এমন অবস্থায় শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের দিকে শ্রীকাইল থেকে দৈনিক প্রায় ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হতো। সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি সেই উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই ধস ঠেকাতেই মূলত কম্প্রেসর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্প বাতিলের আগে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই জরুরি ছিল। অন্যথায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে দেশকে আরও গভীর জ্বালানি সংকটে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম

 

image_pdfimage_print

Posted on: February 1, 2026 | Author: Chandradip News24