যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম চালু রাখার জন্য একটি নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ায় দেশটিতে জনপ্রিয় এই ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ আপাতত নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই চুক্তির ফলে শুধু মালিকানা কাঠামো নয়, বরং কনটেন্ট দেখানোর ধরন, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায়ও ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টিকটক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের অপারেশন একটি আলাদা কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যেখানে প্রধান অংশীদার থাকবেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা। নতুন এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে সাতজন পরিচালক থাকবেন। তাদের মধ্যে একজন থাকবেন টিকটকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শৌ জি চিউ। মূল মালিক প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের অংশীদারত্ব সীমিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশে।
টিকটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর কনটেন্ট সুপারিশ অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারীর পছন্দ, দেখার অভ্যাস ও আচরণের ভিত্তিতে কোন ভিডিও ‘ফর ইউ’ ফিডে আসবে, সেটি এই অ্যালগরিদমই নির্ধারণ করে। নতুন চুক্তির আওতায় এই অ্যালগরিদম ব্যবহারের একটি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলকে। এর আগে ‘প্রজেক্ট টেক্সাস’ উদ্যোগের মাধ্যমে ওরাকল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ডেটা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল।
নতুন ব্যবস্থায় ওরাকলের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ডেটার ভিত্তিতে অ্যালগরিদমের প্রশিক্ষণ, আপডেট এবং পরিচালনা এখন দেশটির ভেতরেই করা হবে। টিকটকের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ডেটা এবং সংশ্লিষ্ট অ্যালগরিদম সম্পূর্ণভাবে ওরাকলের সুরক্ষিত মার্কিন ক্লাউড অবকাঠামোয় সংরক্ষিত থাকবে।
তবে এই চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক টিকটকে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। সিনেটর রন ওয়াইডেন বলেছেন, মালিকানা কাঠামো বদলালেও যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা প্রকৃত সুবিধা নাও পেতে পারেন। একই সঙ্গে সিনেটর এড মার্কি চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে কংগ্রেসে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো— নতুন কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে কি না। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সেই সম্ভাবনা খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্র টিকটকের সবচেয়ে বড় বাজার, যেখানে প্রায় ২০ কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে। নতুন অ্যাপ চালু করা হলে ব্যবহারকারী ও বিজ্ঞাপনদাতা— উভয়ের মধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই টিকটক কর্তৃপক্ষ চাইছে, ব্যবহারকারীরা যেন বুঝতে পারেন যে অ্যাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বড় কোনো ধাক্কা ছাড়াই চলমান থাকবে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য টিকটক নতুন টার্মস অব সার্ভিস চালু করেছে। এখন থেকে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আইনি চুক্তি হবে নতুন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ১৩ বছরের কম বয়সীরা আলাদা ‘আন্ডার ১৩ এক্সপেরিয়েন্স’-এর মধ্যেই টিকটক ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে ভুল বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি হলে সেই ঝুঁকির বিষয়টি ব্যবহারকারীকে মেনে নিতে হবে।
অ্যালগরিদমে পরিবর্তন এলে কনটেন্ট দেখার অভিজ্ঞতা কীভাবে বদলাবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শুরুতে বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়বে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ভিডিও দেখানোর সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কনটেন্টের তুলনায় দেশীয় কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে টিকটক বলছে, মার্কিন ব্যবহারকারীরা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের কনটেন্ট নির্মাতারা আগের মতোই বিশ্বব্যাপী দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। একইভাবে ব্যবসা ও ব্র্যান্ডগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারে সক্রিয় থাকতে পারবে।
এই নতুন চুক্তির আওতায় বাইটড্যান্সের অন্যান্য জনপ্রিয় অ্যাপ— ক্যাপকাট ও লেমনএইটের ভবিষ্যৎও আপাতত নিশ্চিত হয়েছে। টিকটকের মতো এসব অ্যাপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ডেটা সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
সব মিলিয়ে নতুন চুক্তির মাধ্যমে টিকটক যুক্তরাষ্ট্রে আরও নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। তবে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাবে প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক চরিত্র ও কনটেন্ট বৈচিত্র্য কতটা বদলায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





