- ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইতিহাস সৃষ্টি করেছে নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে। ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার মধ্যে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। এই চুক্তি প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজারকে একত্রিত করেছে এবং যার সম্মিলিত বাজার মূল্য প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রায় দুই দশক ধরে চলা আলোচনা ও কয়েকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেলের ক্রয় নিয়ে চাপের মধ্যে এই সমঝোতা অর্জিত হলো।
নতুন চুক্তির ফলে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হবে। এটি কেবল ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হবে না, বরং উভয় পক্ষের ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ পরিবেশকেও উন্নত করবে।
চুক্তির আওতায় ভারতের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিস্তৃত বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ প্রায় ১৪৪টি উপ-খাতে ভারত বিশেষ সুবিধা পাবে। বিপরীতে, ভারত ইইউ-এর জন্য তাদের আর্থিক সেবা, সমুদ্রবন্দর ও টেলিযোগাযোগ খাতসহ ১০২টি উপ-খাত উন্মুক্ত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “এই চুক্তি ভারতের উৎপাদন এবং সেবা খাত উভয়কেই চাঙ্গা করবে। এটি ভারতের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।”
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “ভারত এবং ইইউ ইতিহাস তৈরি করছে। আমরা একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সৃষ্টি করেছি যা ২০০ কোটি মানুষের জন্য সুযোগ বয়ে আনবে।”
অটোমোবাইল খাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ গাড়ি বাজার ইইউ দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত হবে এবং বেশিরভাগ ইউরোপীয় গাড়ির শুল্ক ধাপে ধাপে কমে ৩০–৩৫ শতাংশ হবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ বছর সুরক্ষা নিশ্চিত থাকলেও পরবর্তীতে সীমিত পরিমাণে শুল্কমুক্ত আমদানি অনুমোদিত হবে।
ইইউ পক্ষও উপকৃত হবে। ভারত প্রায় ৯৬ শতাংশ ইউরোপীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমিয়ে দেবে, যার ফলে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে। যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, অপটিক্যাল এবং বিমান যন্ত্রপাতি খাতসহ প্রায় সব খাতে সুবিধা মিলবে।
ভারতও লাভবান হবে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুল্ক তুলে নেবে। সমুদ্রিক ও মৎস্যজাত পণ্য, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, রাবার, চামড়া, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সাধারণ ধাতু, রত্ন ও অলঙ্কার সহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে শুল্ক কমানো হবে।
এই চুক্তি ভারত-ইউ বাণিজ্যের নতুন অধ্যায় শুরু করছে। দুই পক্ষই আশা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য বৃদ্ধির ধারা ইতিবাচক, বিশেষ করে সেবা খাতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিকে নীরিক্ষা করছে। হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যেই সমালোচনা করেছে এবং রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে। তবে ভারত কৌশলগত ধৈর্য বজায় রেখে বাণিজ্যের নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউরোপের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা আনবে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





