শেষ পর্যন্ত বাস্তব হলো শঙ্কা। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে না বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া আসরটি ভারতে আয়োজনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো সমাধানে না পৌঁছানোয় বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার আগেই সরে দাঁড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
সরকার ও বিসিবি শুরু থেকেই ভারতে খেলতে যাওয়ার বিষয়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাতে সম্মতি দেয়নি। উল্টো একদিন আগে বিসিবিকে ২৪ ঘণ্টার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার এই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ সরকার কোনো অবস্থাতেই দলকে ভারতে পাঠাবে না। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ন্যায্যতা পায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি এবং আশা প্রকাশ করেন, আইসিসি শেষ মুহূর্তে হলেও শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।
ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যের পর বিসিবির অবস্থানও পরিষ্কার হয়ে যায়। বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, তারা এখনও চান বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় হোক এবং সেই দাবিতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। তবে আইসিসির অনমনীয় অবস্থান ও ভোটাভুটির ফল বিসিবির সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়।
আইসিসির বোর্ড সভায় বাংলাদেশ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভোটের মাধ্যমে। সেখানে বিসিবি পরাজিত হয় ১২-২ ভোটে। বাংলাদেশের পক্ষে কেবল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ভোট দেয়। অধিকাংশ পূর্ণ সদস্য দেশের সমর্থন না পাওয়ায় ক্রিকেট কূটনীতিতে বিসিবির সব প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে।
ভোটাভুটির পর আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতেই আয়োজন করা হবে। টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে ভেন্যু পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও জানায় তারা। একই সঙ্গে আইসিসি জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশ অংশ না নিলে ‘সি’ গ্রুপে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম তিনটি ম্যাচ ৭, ৯ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এবং শেষ ম্যাচ ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই সূচি অনুযায়ী খেলতে রাজি না হওয়ায় ২০০৭ সাল থেকে টানা বিশ্বকাপে খেলে আসা বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় বড় ছেদ পড়ল। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি ঘটছে।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি, যখন ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপরই বিসিবি নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত জানায় এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের দাবি তোলে।
পরবর্তী প্রায় ২০ দিন বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে একাধিক চিঠি চালাচালি, বৈঠক এবং আলোচনা হয়। আইসিসির প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে বৈঠকও করে। বিসিবি বারবার দাবি করে, তাদের অবস্থান আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত। অন্যদিকে আইসিসি জানায়, স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও আয়োজক দেশের আশ্বাস অনুযায়ী ভারতে বাংলাদেশের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি নেই।
আইসিসির শীর্ষ পর্যায়ে ভারতীয় প্রভাব এবং ভোটিং কাঠামো নিয়েও নানা আলোচনা উঠে আসে ক্রিকেট অঙ্গনে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে সংস্থাটি।
সব যুক্তি-পাল্টা যুক্তির পর দেশের নিরাপত্তা ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এর ফলে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না। ক্রিকেটপ্রেমী দেশটির জন্য এটি কেবল ক্রীড়াগত নয়, ভাবমূর্তির দিক থেকেও বড় এক ধাক্কা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





