দেশজুড়ে এলপি গ্যাসের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংকট যেমন বাড়ছে, তেমনি লাগামহীনভাবে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে এলপি গ্যাসের দাম। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের বড় একটি অংশ বলছে, সরকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যত ব্যর্থ।
খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভ্যাট কমানো, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো শুরুতেই থেমে গেছে। ফলে বাজারে এক ধরনের অরাজকতা তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় নির্ধারিত মূল্যে এলপি গ্যাস মিলছে না, আবার কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
এলপি গ্যাসের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতেও। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. সিরাজুল মাওলা জানান, সারাদেশে প্রায় এক হাজার এলপিজি অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশনের মাসিক চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার টন এলপিজি। অথচ ডিসেম্বর মাসে তারা সরবরাহ পেয়েছেন মাত্র ২০ শতাংশ। এতে এলপিজিনির্ভর যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। অনেক চালক বাধ্য হয়ে অকটেন ব্যবহার করছেন, যা ভবিষ্যতে অকটেন সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এলপি গ্যাসের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও রান্নার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
এই সংকটের পেছনে কে দায়ী, তা নিয়ে চলছে দোষারোপের রাজনীতি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মূল সমস্যা সরবরাহে। অন্যদিকে সরকারের দাবি, সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো ঘাটতি নেই। আমদানিকারকরাও একই কথা বলছেন। সরকার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। আমদানিকারকরাও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আহ্বান জানান।
এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। তারা হয়রানির অভিযোগ তুলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘট শুরুর দিনই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বৈঠক করে তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেয়। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে এলপিজির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং ভোক্তা পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবুও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।
এলপি গ্যাসের আগুন দামের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। একজন সিনিয়র সাংবাদিক ফেসবুকে লেখেন, তিনি ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ১০০ টাকায়, তাও অনেক কষ্ট করে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রান্না না হলে মানুষ খাবে কী। বাইরে খাওয়ার সুযোগও কম, কারণ গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের দামও বেড়ে গেছে।
ভোক্তারা যখন চরম দুর্ভোগে, তখন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একটি বিবৃতিতে দাবি করেছে, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। বিভাগটির তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর ২০২৫ মাসে এলপিজি আমদানি ছিল ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন, যা ডিসেম্বর মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বাড়লেও বাজারে সংকটের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই এবং দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন ভোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আমদানি বাড়লেও সঠিক নজরদারি ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে এলপি গ্যাস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





