বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তালিকাভুক্ত ২৭টি বিমা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা। কোথাও প্রতিকূল মতামত, কোথাও শর্তযুক্ত মতামত, আবার কোথাও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নিরীক্ষকদের এ ধরনের মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে যদি ‘গোয়িং কনসার্ন’ বা ভবিষ্যতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকে, তবে সেটি পুঁজিবাজারের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। এসব কারণেই বিমা খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আইডিআরএর চেয়ারম্যান বরাবর বিএসইসির করপোরেট রিপোর্টিং ডিপার্টমেন্ট একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে আসা পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরে প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যেসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পিএলসি, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পিএলসি, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, জনতা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।
নিরীক্ষকদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোথাও আর্থিক তথ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে, কোথাও আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিরীক্ষকরা বিশেষ কোনো বিষয়ে আলাদা করে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছেন। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ব্যবসা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয় একত্রে বিমা খাতের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের ওপর প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিএসইসির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ ধরনের প্রতিকূল বা শর্তযুক্ত মতামত বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে আর্থিক প্রতিবেদনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএ কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বিমা খাতে আর্থিক সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে কমিশন।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকদের মতামতের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আইডিআরএকে জানানো হয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তাদের এখতিয়ারভুক্ত।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল-আমিন মনে করেন, আর্থিক খাত সংস্কারের আলোচনায় বিমা খাত অনেকটাই উপেক্ষিত। দাবি পরিশোধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। তার মতে, ফরেনসিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আনা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে দ্রুত অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





