প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ, তবু রাজস্বে ঘাটতি ২৪ হাজার কোটি

Views: 27

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস অতিক্রম করলেও রাজস্ব সংগ্রহে লক্ষ্য অর্জন হয়নি, বরং ঘাটতি আরও গভীর হয়েছে। প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ধারা দেখা গেলেও রাজস্ব আদায়ের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ স্পর্শ করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থায় গতি ফিরলেও আদায়ে চাপ থেকে গেছে। পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সময়ে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাকে উদ্বেগে ফেলেছে।

প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশের বেশি হলেও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই আয়করের দুর্বলতা, আমদানি কমে যাওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা প্রবাহকে দায়ী করছেন। এনবিআরের পরিসংখ্যান বলছে—রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় অংশ বা স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) থেকে এসেছে ৫৮ হাজার ২৩১ কোটি টাকা, তবে তা লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক খাত থেকে আদায় হয়েছে ৪২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর মিলিয়ে এসেছে ৪৭ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। কিন্তু ভ্যাট খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলোচ্য পাঁচ মাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৯ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা, বিপরীতে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। আমদানি খাতেও পিছিয়ে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। ৫০ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকার লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে তার চেয়ে অনেক কম, ফলে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। মূসক খাতেও ঘাটতি কম নয়—৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।

এনবিআরের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন—ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব, আমদানি হ্রাস, আয়করে স্থবিরতা এবং জটিলতা—এসব কারণে রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শুধু নভেম্বর মাসের হিসেবেই দেখা যায়, লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৩২৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, আর আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, যার ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ৬৫ হাজার কোটি টাকা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাজেটের এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি থাকলেও ঘাটতির চিত্র উদ্বেগজনক। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতি বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থার বিস্তার না হলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সরকার রাজস্ব ঘাটতি কমাতে কর আহরণ জোরদার, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সক্রিয় করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলো কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাজারদর, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, শুল্কনীতি এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির অংশগ্রহণের ওপর। দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই ঘাটতি কমাতে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

“মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম”

 

image_pdfimage_print

Posted on: December 22, 2025 | Author: Chandradip News24