পানিতে পড়লেই বাঁচবে জীবন ভোলার তরুণের যুগান্তকারী ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’

Views: 18

এক মুহূর্তের অসাবধানতা, আর তাতেই নিভে যায় একটি ছোট্ট প্রাণ। নদী–খাল আর পুকুরে ঘেরা উপকূলীয় জনপদে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু যেন নিত্যদিনের ভয়াবহ বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে বদলাতে স্বপ্ন দেখেছেন ভোলার মনপুরার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন। আর সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’—একটি লকেট আকৃতির প্রযুক্তি, যা শিশু পানিতে পড়লেই বেজে উঠবে সাইরেন, আর সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকের মোবাইলে পৌঁছে যাবে সতর্কবার্তা।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলা পৌরসভার পুকুরে এই ডিভাইসের পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেখা যায়, সাঁতার না জানা এক শিশু পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ডিভাইসটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই চারপাশে বেজে ওঠে বিপদ সংকেত। শব্দ শুনে ছুটে আসেন মানুষ, উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রক্ষা পায় একটি প্রাণ।

এই ডিভাইসটি শিশুর গলায় লকেটের মতো ঝুলিয়ে রাখা যাবে। অভিভাবকের কাছে থাকবে একটি ছোট পোর্টেবল রিসিভার। শিশু পানির সংস্পর্শে এলেই রিসিভার থেকে সাইরেন বাজবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিভাবকের মোবাইলে কল যাবে। শুধু তাই নয়, এতে যুক্ত আছে জিপিএস প্রযুক্তি—যার মাধ্যমে জানা যাবে শিশুটি ঠিক কোন স্থানে পানিতে পড়েছে।

প্রদর্শনী দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। উপস্থিত ছিলেন ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান। তারা উদ্ভাবনটির প্রশংসা করেন এবং এর প্রসারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন,“ভোলার মতো পানিবেষ্টিত এলাকায় শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। এই উদ্ভাবন মানুষের জন্য আশার আলো। এর প্রসারে আমরা সব ধরনের সহায়তা করব।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন,“এই ডিভাইস যদি একজন শিশুর জীবনও রক্ষা করতে পারে, সেটাই হবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। তরুণ তাহসিনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।”

উদ্ভাবক তাহসিন জানান, পানিতে ডুবে তার দুই খালাতো বোনের মৃত্যুই তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। সেই বেদনা থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন—কীভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে এই মৃত্যু রোধ করা যায়। বিজ্ঞানপ্রেমী তাহসিন নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’-এ।

তিনি বলেন,
“আমি চাই আর কোনো পরিবার যেন পানিতে ডুবে শিশুকে হারিয়ে শোকে ভেঙে না পড়ে। এই ডিভাইস শিশুর সঙ্গে থাকলে দুর্ঘটনার মুহূর্তেই সবাই জানতে পারবে।”

ডিভাইসটি তৈরি করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা, যা পরিবারের সহায়তায় জোগাড় করা হয়েছে। শুরুতে লকেটটির আকার ও ওজন বেশি ছিল। কিন্তু এখন সেটি মাত্র ২ গ্রাম ওজনের—শিশুর গলায় ঝোলানো একেবারেই সহজ।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৪ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে উপকূলীয় এলাকার ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা। সচেতনতা ও সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির এই ব্যবহার নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাহসিনের উদ্ভাবন যেন শুধু একটি যন্ত্র নয়—এ যেন অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক নীরব প্রতিশ্রুতি।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫

image_pdfimage_print

Posted on: January 13, 2026 | Author: Chandradip News24