অপূর্ব অপু,সময় টেলিভিশন, বরিশাল ব্যুরো :: ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল। ব্রিটিশ যুগে বরিশালকে বলা হতো প্রাচ্যের ভেনিস। প্রকৃতিই যেন এক অনন্য রূপে গড়েছে কীর্তনখোলার পাড়ের বরিশালকে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত একসঙ্গে দেখার দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। রয়েছে বরগুনার সবুজ বন, ভোলার চর কুকরিমুকরিসহ নানা সৌন্দর্য। প্রকৃতির এতসব লীলাভূমিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পের অপার দ্বার উন্মোচন হয়েছে বিভাগটিতে। তবে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেই সম্ভাবনা।
আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়, হয়ত মানুষ নয় হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে….। শুধু ধানসিঁড়িই নয়, বরিশালকে রূপবতী করেছে কীর্তনখোলা, পায়রা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, বিশখালি, আগুনমুখার মতো নান্দনিক নামের বেশ কয়েকটি নদী। ঔপনিবেশিক যুগে বরিশাল হয়ে উঠেছিল বাংলার আধুনিকতার প্রাণকেন্দ্র।
বরিশাল শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে মাধবপাশা দুর্গা সাগরদিঘি। ৫৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তীর্ণ দিঘিটিকে একনজর দেখতে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। সেখানে থেকে একটু এগুলেই চোখজুড়ানো বিভাগের সবচেয়ে নান্দনিক মসজিদ, বায়তুল আমান জামে মসজিদ। আছে আড়াইশ বছরের পুরানো গ্রিক স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে স্থাপনা, শহরের বগুড়া রোডে- অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। দেখতে একতলা হলেও উচ্চতায় প্রায় ৫ তলা ভবনের সমান। শহর থেকে দক্ষিণে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বে তালতলি এলাকায় কীর্তনখোলা নদীতে যে স্থায়ী বাঁধ দেয়া হয়েছে, তা এখন আরেক দর্শনীয় স্থান।
রাফি নামে এক পর্যটক জানান, বরিশালের অধিকাংশ পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে। যেমন রাস্তাঘাট অনুন্নত তেমনি অভাব রয়েছে সড়কবাতির। সরকার এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াবে বলে আশা পর্যটকদের।
কুয়াকাটা দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখানে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। এ সৈকতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণের আরেক নতুন স্পট ‘চর বিজয়’। লাল কাঁকড়া ও পরিযায়ী পাখিদের মিলন মেলায় জায়গাটি মুখরিত থাকে প্রতিটি মুহূর্ত। সৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা চরটিতে বাড়ছে পর্যটক।
আরিফ নামের এক পর্যটক জানান, সম্ভাবনাময় কুয়াকাটার দিকে আরও নজর দেয়া উচিত সরকারের। সরকারি উদ্যোগ বাড়লে আরও পর্যটক বান্ধব হয়ে উঠবে কুয়াকাটা।
দ্বীপ জেলা ভোলা প্রকৃতিপ্রেমীদের মন ভোলাবে তার অরুপ সৌন্দর্যে। জেলার চর কুকরীমুকরীতে প্রতিদিন ভিড় করেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী। আকাশের বুকে অতিথি পাখির ছুটে চলার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে নিজেকেও দুরন্ত করে মন। একইরকম রূপ মনপুরা ও ঢালচরেও।
তবে প্রতিবছরই পর্যটক সংখ্যা বাড়লেও, বাড়েনি কাঙ্ক্ষিত সুযোগ সুবিধা। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু রেস্টহাউজ থাকলেও সরকারি কার্যক্রমে ভাটা। আবিদ নামে এক পর্যটক জানান, সম্ভাবনাময় এই জায়গা শুধু সরকারের উদ্যোগের অভাবে ভোগান্তিতে রয়েছে পর্যটকরা। আশা করছি সরকার দৃষ্টি দেবে।
সমুদ্রের ঢেউয়ের মিতালী নিয়ে বরগুনার হরিণঘাটা ইকোপার্ক এবং ট্যাংরাগিরি ইকো পার্কের মায়ায় পড়তে হবে যে কাউকে। জেলার তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলায় সম্ভাবনাময় পর্যটনের দ্বার উন্মোচন করেছে সবুজ বন। তালতলী উপজেলায় রয়েছে ২০০ বছরের পুরোনো আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দৃষ্টিনন্দন ধর্মীয় উপাসনালয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ট্যাংরাগিরি বনাঞ্চল এবং এ বনে অবস্থিত বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। এছাড়াও রয়েছে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। পাথরঘাটা উপজেলায় হরিণঘাটা ইকোপার্ক লালদিয়া চর বিহঙ্গ দ্বীপ রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমৃদ্ধ এই স্থানগুলো পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় স্থান।
তবে নানা সংকটে বিকশিত হচ্ছে না জেলার পর্যটন শিল্প। জেলা পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোক্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আরিফ খান বলেন, তালতলী টেংরাগিরি ইকোপার্ক, দুইশ’ বছরের পুরোনো রাখাইন আদিবাসীদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় উপাসনালয়, শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, পাথরঘাটার হরিণঘাটা ইকোপার্ক, লালদিয়া চর, বিহঙ্গ দ্বীপ, বরগুনার সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট রয়েছে। এসব জায়গাগুলো ভ্রমণের জন্য উৎকৃষ্ট মানের। কিন্তু সরকারের এদিকে নজর নেই। যে কারণে এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ স্থানগুলোর ভগ্নদশা।
আরও পড়ুন: দীর্ঘ সময় পর স্বস্তি, নীল জলরাশিতে মাতোয়ারা পর্যটকরা
এগুলোকে সংস্কার করলে বরগুনা জেলার পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে অনেকটা এগিয়ে থেকেও বিকশিত হচ্ছে না বরিশাল বিভাগের পর্যটনশিল্প। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোক্তা কমিটির সভাপতি সোহেল হাফিজ বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটনের বিষয়ে সচেতন নয়। তাছাড়া সরকারেরও এ বিষয়ে উদাসীনতা রয়েছে। এখানে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। আবার উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কোনো উদ্যোগও নেই। অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকরা এখানে আসলে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হন। থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা নেই। যাতায়াত ব্যবস্থার করুন অবস্থা। এজন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য মৌলিক কিছু চাহিদা পূরণ করলেই জেলাটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আছাদুজ্জামান বলেন, পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ ও পর্যটকবান্ধব স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। সরকারি উদ্যোগের কারণে প্রতিনিয়ত আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে পর্যটন এলাকাগুলো। দ্রুত এ বিষয়ে আরও উদ্যোগ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, আকাশ ও সড়ক পথের পাশাপাশি রাজধানী থেকে বরিশালের ৬ জেলায় আসতে নদী পথের বিলাসবহুল লঞ্চ এখনও পছন্দের তালিকায় এ অঞ্চলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫





