পটুয়াখালীর দশমিনায় ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল’

Views: 95

 

মো:আল-আমিন, পটুয়াখালী : পটুয়াখালী সদর থেকে সড়ক পথে দশমিনা উপজেলার আউলিয়াপুর লঞ্চঘাট থেকে তেতুলিয়া নদী দিয়ে প্রায় সোয়া ঘণ্টা ট্রলারে গেলে দেখা মেলে দুর্গম চরবোরহান এলাকাটির। চারদিকে নদীবেষ্টিত এই চরে সহজে যাতায়াত করা যায় না। দিনে একটিমাত্র ট্রলার চলাচল করে, যা ওই এলাকার মানুষের ভরসা। সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই চরে দেশের অন্তত সাতটি জেলার ভূমিহীন ও নদী ভাঙনে বাড়িঘর হারানো মানুষের বসবাস।

এখানকার মানুষের প্রধান পেশা মাছ শিকার আর কৃষিকাজ। জীবনযাত্রা অত্যন্ত নিম্নমানের। খেয়েদেয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছে তারা। চরবোরহানে বেড়িবাঁধ না থাকায় বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটায় রাস্তাঘাটসহ ঘরবাড়ি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়।

ওই সময় প্রতিদিনই নদীর তীব্র ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে এই মানুষগুলো। তবু একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই নিজেদের উজাড় করে দিতে মোটেই কার্পণ্য করে না চরবোরহানের মানুষ।

নিজের সংসারের খরচ মেটাতে চরবোরহানের শিশুরাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মাছ শিকার বা মাঠে কাজ করে। লেখাপড়া তাদের কাছে বিলাসিতার মতো।

বসুন্ধরা গ্রুপ এই শিশুদের কথা চিন্তা করে দক্ষিণ চরবোরহানে ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। সেই স্কুলটি শুরু করতেই ঢাকা থেকে আসা বসুন্ধরা শুভসংঘ টিমসহ আমাদের চরবোরহানে আসা। স্কুলটির সামনে জড়ো হয়েছেন এলাকার শত শত নারী-পুরুষ। সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেছে।

চরবোরহানের বাসিন্দা রাশিদ রাঢ়ী (৭০) বলেন, ‘আমাগো পোলাপানের এহন (এখন) আর পানি-কাঁদা ভাইংগা স্কুলে যাওন লাগবে না। আমাগো ঘরের ধারে (কাছে) স্কুল দেখলেই মনটা ভইরা যায়। পোলাপানগুলা দেখলেও আনন্দ লাগে। এতক্ষণ পোলাপানগুলা স্কুলের সামনে দেইখ্যা মনটায় বড় আনন্দ লাগছে। মন চায় হারা দিন স্কুলের সামনে বইস্যা থাহি। যারা এই স্কুলডা কইরা দিছে, হেগো লাইগ্যা মন থেইক্যা অনেক দোয়া করি।’

নতুন বই পেয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী পুতুল আনন্দে আত্মহারা।

পুতুল বলে, ‘আইজ রাইতেই আমি বইডা পড়মু। অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। বইডা দেইখ্যা আমার ভালো লাগছে।’

আরেক শিক্ষার্থী রোজিনা বলে, ‘আমাগোরে এমন নতুন বই কেউ আর দেয় নাই। আমরা বই-খাতা পাইলে স্কুলে যাইমু।’

শিক্ষার্থী রুকাইয়ার মা লিপি বেগম বলেন, ‘আমরা লেহাপড়া জানি না। আমারো ইচ্ছা করে মাইয়াডারে লেহাপড়া শিখাই। এই সুযোগ করে দিছে বসুন্ধরা গ্রুপ। আমি কামের ফাঁকে মাইয়াডারে স্কুলে পাডাইতে পারমু। স্কুল কামাই (বন্ধ) যাইবে না। মাইয়ার বাপেও এহন মাইয়াডারে পড়াইবে। এই স্কুলেই আমার মাইয়ারে পড়ামু।’

শিক্ষার্থী রুবিনার মা লাবনী বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী নাই। খাওন খরচই জোগাড় করতে কষ্ট হয়। মাইয়ারে পড়ামু কেমনে? এহন বাড়ির ধারে স্কুল হইছে। হেরা খাতা, কলম, জামাকাপড় দিবে। এহন আর চিন্তা করতে হইবে না। মাইয়াডারে পড়াইতে পারলে আমার আর কোনো কষ্টই কষ্ট মনে হইবে না।’

প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী উজ্জ্বলের মা ময়না বেগম বলেন, ‘আমাগো গ্রাম দিয়া সরকারি স্কুল তিন কিলোমিটার। অত দূরে যাইয়া লেহাপড়া করতে পারে নাই। এহন প্রত্যেক দিন স্কুলে যাইবে। নতুন বছরে বই, খাতা, পেন্সিলসহ পাইবে নতুন জামা। আমাগো পোলাপাইনদের পড়ালেহার সব খরচই হেরা দিব। আল্লায় হেগো ভালা করব।’

সম্প্রতি বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে দশমিনা উপজেলার চরবোরহান ইউনিয়নের দক্ষিণ চরবোরহানে ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল’ চালু করা হয়েছে। শুরুতেই ৬৫ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু এই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সেদিন উপস্থিত বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিক্ষার্থীদের নতুন বই ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির ইয়াসির আরাফাত রাফি, শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, মো. আবীর খান, শাহ্ মো. হাসিবুর রহমান হাসিব, আলমগীর, ফরিদ মিয়া, বসুন্ধরা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা মামুন, দশমিনা উপজেলা শাখার সাফায়েত হোসেন, হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

image_pdfimage_print

Posted on: December 30, 2023 | Author: Chandradip News