কৃষি, মৎস্য ও তাঁতশিল্পে প্রান্তিক নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বদলাতে শুরু করেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার অর্থনৈতিক চিত্র। সংসারের চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে মাঠ, নদী ও তাঁতঘরে নারীদের অবিরাম শ্রম আজ পরিবার ও সমাজে স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত তৈরি করছে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পাথরঘাটা সদর ও চরদুয়ানী ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের গৃহবধু নারীরা দলবদ্ধভাবে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পুরুষের সহায়তা ছাড়াই তারা ধানসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও মৌসুমি ফসল উৎপাদন করছেন। ধান কাটা, মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানো থেকে শুরু করে চাল ভাঙানো পর্যন্ত সব কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করছেন তারা। বলেশ্বর নদীসংলগ্ন গাববাড়িয়া গ্রামে ধান কাটার মৌসুমে নারীদের দলবদ্ধ শ্রম এখন নিয়মিত দৃশ্য।
স্থানীয় নারী কৃষক রোকেয়া বেগম, আলেয়া বেগম ও জোছনা বেগম জানান, কৃষিকাজে সফল হওয়ায় তারা এখন নিজেরাই আয় করছেন এবং সংসারের ব্যয় নির্বাহ করছেন। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনি আর্থিকভাবে কারও ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে না।
পাথরঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিপন চন্দ্র ঘোষ বলেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করে এসব নারী কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন। তাদের উদ্যোগ টেকসই করতে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
মৎস্য খাতেও বরগুনার নারীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ছয় উপজেলায় পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার জেলের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার জেলেবধূ সরাসরি মাছ আহরণে যুক্ত। তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙ্গা গ্রামের জেলে ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী আলেয়া বেগম প্রতিদিন ভোরে স্বামীর সঙ্গে নদীতে গিয়ে জাল তোলা, মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের কাজে অংশ নেন। একই সঙ্গে ঘরের কাজ ও সন্তানদের দেখভালের দায়িত্বও তাকেই সামলাতে হয়।
বরগুনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, উপকূলীয় জেলে পরিবারের নারীরা পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করলেও তাদের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
অন্যদিকে তালতলী উপজেলার রাখাইন পল্লীগুলোতে হস্তচালিত তাঁতে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাখাইন নারীরা। মায়ানমার থেকে আনা সুতা দিয়ে তারা শীতের চাদর, শার্ট পিস, লুঙ্গি, গামছা ও ব্যাগ তৈরি করছেন। শীত মৌসুম ও ঈদকে কেন্দ্র করে এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। তালতলীর ১৭টি রাখাইন পল্লীতে দুই শতাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে। কোনো কোনো পরিবারে একাধিক তাঁত পরিচালিত হচ্ছে।
ছাতনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অংতেন তালুকদার বলেন, তাঁতশিল্প রাখাইন নারীদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। এই শিল্প তাদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রতীক।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, নারী-পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগই উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচনে এসব কর্মঠ নারী অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং নারীদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি মিললে বরগুনার এই প্রান্তিক নারীরাই ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠবেন।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫





