দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানের মাত্র ২৪ দিনের মাথায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) ভোর রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত স্টোররুমে আগুন লাগে। এ ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও স্টোররুমে সংরক্ষিত বেডশিট, কম্বল, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, আসবাবপত্র, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও চিকিৎসা সামগ্রী পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন জানান, ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে আগুনের খবর পেয়ে গলাচিপা ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে দশমিনা ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সহায়তায় যোগ দেয়। অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে স্টোররুমে সরাসরি প্রবেশ সম্ভব না হওয়ায় জানালার কাচ ভেঙে পানি ছিটিয়ে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পুরোপুরি আগুন নির্বাপণে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।
অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত পানির কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে পানি জমে যায়। ফলে সকাল থেকে আউটডোর সেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়, যা দুপুরের দিকে স্বাভাবিক হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল সরিয়ে নিতে গলাচিপা পৌরসভার পক্ষ থেকে সহায়তা করতে দেখা গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে ভোরেই হাসপাতালে ছুটে যান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন। তিনি জানান, স্টোররুমে সংরক্ষিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কাগজপত্র আগুনে পুড়ে গেছে। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।
গলাচিপা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের অফিসার মো. কামাল হোসেন বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি ইউনিট ও দুটি পাম্প নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আগুনের উৎস এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আলাদা তদন্ত হতে পারে বলেও জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান, গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ জিল্লুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত স্টোররুম ও হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, লিনেন সামগ্রীর একটি কক্ষ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, যাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ২৯ ডিসেম্বর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযানে হাসপাতালের স্টোর রেজিস্ট্রারে ওষুধ মজুদের তথ্য ও বাস্তব সরবরাহের মধ্যে গরমিল পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ মজুদ থাকলেও রোগীদের দেওয়া হচ্ছিল না বলে অভিযোগ উঠে। পাশাপাশি খাবারের মান, কর্মচারীদের হাজিরা এবং সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থায় অনিয়মের নানা প্রমাণ পায় দুদক।
পটুয়াখালী দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল লতিফ হাওলাদারের নেতৃত্বে ওই অভিযানে উপসহকারী পরিচালক খালিদ হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। তখন দুদক জানায়, হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
দুদকের সেই অভিযানের মাত্র ২৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট স্টোররুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





